২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট

সরকারি ব্যয়ের লাগাম না টানলে বাজেট কখনই সমতাভিত্তিক ও জনকল্যাণকর হবে না

গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে এমন সংকটের মধ্যেই দেশের দায়ভার গ্রহণ করে অন্তর্বর্তী সরকার। এ সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বড় ধরনের বিপর্যয় ঠেকানো গেছে।

দেশের অর্থনীতিতে কয়েক বছর ধরে বহুমুখী সংকট বিদ্যমান। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অপ্রতুল রাজস্ব আয়, রিজার্ভ ক্ষয়, ডলারের বাজারদরে অস্থিরতা, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নিম্নমুখিতা, ভঙ্গুর ব্যাংক ও আর্থিক খাত সব মিলিয়ে প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছিল অর্থনীতি। গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে এমন সংকটের মধ্যেই দেশের দায়ভার গ্রহণ করে অন্তর্বর্তী সরকার। এ সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বড় ধরনের বিপর্যয় ঠেকানো গেছে। তবে আগে থেকে বিদ্যমান সংকটগুলো এখনো সেভাবে কাটিয়ে ওঠা যায়নি। এমন নাজুক পরিস্থিতিতেই গতকাল এ সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য বাজেট প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেছেন। উল্লেখ্য, দায়িত্ব গ্রহণের পর দীর্ঘদিন পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া বাজেটই টেনে নিয়ে গেছে অন্তর্বর্তী সরকার। মাঝপথে সে বাজেট সংশোধন করা হয়েছিল।

প্রত্যাশা ছিল আসন্ন বাজেট প্রণয়ন করা হবে বাস্তবতার নিরিখে। বিশেষত সরকারি ব্যয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা হবে। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে তেমন কিছু পরিলক্ষিত হচ্ছে না। প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ঘোষণা করা হয়েছে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা, যা বিগত বাজেট থেকে হাজার কোটি টাকা কম। কিন্তু চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা বেশি। বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ ১৮ হাজার, যা আহরণের দায়িত্ব বর্তানো হয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওপর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে এনবিআরে সংস্কার ঘিরে যে বিশৃঙ্খলা রয়েছে এবং বিদ্যমান কাঠামোগত দুর্বলতায় সংস্থাটি এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হবে। এমনকি ৪৬ হাজার কোটি টাকা করবহির্ভূত রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রাও ধরা হয়েছে, সেটিও বাস্তবতাবিবর্জিত বলেই মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাছাড়া পুরো বাজেট বাস্তবায়নের সম্ভাবনাও ক্ষীণ, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানের দিকে লক্ষ করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিগত সরকারের ২০০৮-০৯ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত বাজেট বাস্তবায়নের গড় হার ছিল ৮৬ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থবছরের শুরুতে যে বাজেট ঘোষণা করা হয়েছিল, বছর শেষে এর ১৪-১৫ শতাংশ অবাস্তবায়িত থেকে গেছে। পরে এ অবাস্তবায়িত বাজেটের অংশ আরো বড় হয়েছে। এদিকে চলতি অর্থবছরেও বাজেট বাস্তবায়ন না হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। কেননা অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই (জুলাই-এপ্রিল) রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ ঠেকেছে ৭১ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকায়।

অন্যদিকে চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে এর আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় সরকারের পরিচালন ব্যয় বেড়েছে ২৬ শতাংশ। ব্যয়ের ক্ষেত্রে আগের সরকারের ধারাবাহিকতা বর্তমানে অব্যাহত রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আসন্ন বাজেটেও সংশোধিত বাজেটের তুলনায় বেশি ব্যয় কমানোর সুযোগ থাকলেও বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার সেটিকে কাজে লাগাতে পারেনি বলে তাদের অভিমত। সরকারের খাতভিত্তিক ব্যয় পর্যালোচনার ভিত্তিতে বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে সবচেয়ে বেশি ৭৫ দশমিক ৪১ শতাংশ ব্যয় বেড়েছে সাধারণ সরকারি সেবা খাতে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে এ খাতে সরকারের ব্যয় হয়েছে ৭৩ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে ব্যয় হয়েছিল ৪২ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা।

এমন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আসন্ন অর্থবছরের বাজেটের যে দর্শন নির্ধারণ করা হয়েছে ‘সমতাভিত্তিক কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে তোলা’ তা কীভাবে সম্ভব প্রশ্ন জাগে। কেননা সরকারের ব্যয় বৃদ্ধির অর্থ হলো ঋণনির্ভরতা বাড়বে। আর এ ঋণ পরিশোধের চাপ পড়বে অর্থনীতিতে এবং বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ আরো কমবে। অথচ উচ্চ মূল্যস্ফীতি, স্বল্প মজুরি, কর্মসংস্থানের অভাব, ঊর্ধ্বমুখী বেকারত্বের হার এসব থেকে মানুষকে স্বস্তি দিতে হলে বেসরকারি খাতের বিকাশ গুরুত্বপূর্ণ।

অথচ বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগ এক ধরনের স্থবির অবস্থায় রয়েছে। মূল্যস্ফীতির হার কমানোর কৌশল হিসেবে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। এর প্রভাবে ঋণপ্রবাহ বাড়েনি। অন্যদিকে বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও নানা অবকাঠামোগত অসুবিধা এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে বিনিয়োগপ্রবাহও বাড়েনি। এতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি যেমন শ্লথ হয়েছে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সরকারি সেবায় ব্যয় বেড়েছে কিন্তু বেসরকারি খাতের কর্মজীবীদের মজুরি বাড়েনি, জীবনমানের উন্নয়ন ঘটেনি। বলা বাহুল্য, রাজস্বস্বল্পতায় সরকারি খাতেও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। বাজেট প্রস্তাবনা উপস্থানের সময় অর্থ উপদেষ্টা জুনের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশে নেমে আসার আভাস দিয়েছেন। কিন্তু বেসরকারি খাতে উৎপাদন ও কর্মকাণ্ডের গতি না বাড়লে আরো মূল্যস্ফীতির কশাঘাত থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করা কঠিন হবে।

রাষ্ট্রের নাগরিকদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, সুরক্ষা, মৌলিক সেবার নিশ্চয়তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সর্বোপরি বৈষম্য প্রশমনের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রণীত বাজেটগুলো পরিচিত জনকল্যাণমুখী বাজেট হিসেবে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের মানুষ বহু বছর ধরে জনকল্যাণমুখী বাজেটবঞ্চিত হয়ে আসছে। এতদিন বাজেট মানেই ছিল উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের নামে জনগণের অর্থের যথেচ্ছ তছরুপ। আর পরিচালন ব্যয়ের নামে সরকারি কর্মকর্তাদের অপব্যয় ও দুর্নীতি। অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে সুযোগ ছিল জনকল্যাণমুখী বাজেট দিয়ে জনগণকে স্বস্তি দেয়ার; দেশী-বিদেশী ঋণনির্ভর ঘাটতি বাজেট থেকে বেরিয়ে আসার; শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে বৈষম্য কমিয়ে আনার। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেট থেকে তেমন কোনো আশার আলো দেখা যাচ্ছে না। রাজনৈতিক কোনো চাপ না থাকলেও অন্তর্বর্তী সরকার যেন জনতুষ্টির বাজেটের দিকেই হেঁটেছে।

সরকারকে ব্যয় কমিয়ে আনতে হবে। কারণ সরকারি সেবা খাতে ব্যয় বাড়লে সেটিও চাহিদাজনিত মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে তুলবে। তাতে সমাজে বৈষম্য বাড়বে বৈ কমবে না। অর্থ উপদেষ্টা বাজেট বক্তব্যে বলেছেন, সম্পদের সুষম বণ্টন ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়া এবারের বাজেটের অন্যতম লক্ষ্য। পাশাপাশি রাজস্ব আয় ও সরকারি ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে একটা যৌক্তিক ও বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট প্রণয়নও হবে এ বাজেটের একটি অন্যতম উদ্দেশ্য। কিন্তু চলতি অর্থবছরের এখন পর্যন্ত সরকারি ব্যয়ের যে চিত্র এবং রাজস্ব আয়ের যে ধীরগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে তাতে রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য বজায় থাকবে না তা সহজেই অনুমেয়। কাজেই আসন্ন অর্থবছরের বাজেট অনুমোদনের আগে এসব ব্যয়ের পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

আরও